আকীদার অর্থ
আভিধানিক দিক থেকে আকীদাহ শব্দটি উৎকলিত হয়েছে, আল-আকদু, আতাওসীকু, আল-ইহকামু, বা দৃঢ় করে বাঁধা বুঝানোর অর্থে। পরিভাষায় আকীদাহ বলতে বুঝায়: এমন সন্দেহাতীত প্রত্যয় এবং দৃঢ় বিশ্বাসকে যাতে বিশ্বাসকারীর নিকট কোন সন্দেহের উদ্রেক করতে পারে না। তাহলে ইসলামী আক্বীদা বলতে বুঝায় :
মহান আল্লাহর উপর দৃঢ় ঈমান বিশ্বাস রাখা, অনিবার্য করণেই আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর আনুগত্যকে মেনে নেওয়া এবং ফিরিশতা, আসমানী কিতাবসমুহ, সকল রাসূল, কিয়ামত দিবস, তাকদীদের ভালো মন্দ, কুরআন হাদীসে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত সকল গায়েবী বিষয় এবং যাবতীয় সংবাদ, অকাট্যভাবে প্রমাণিত সকল তত্বমূলক বা কর্মমূলক বিষয়ের উপর দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত:
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত বলা হয় ঐ সমস্ত ব্যক্তিদেরকে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের অনুসারী এবং তাঁর সুন্নাতের অনুগত এবং তাদেরকে আল জামা‘আত বলা হয় এই মর্মে যে, তাঁরা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে, দ্বীনের ব্যাপারে বিচ্ছিন্ন না হয়ে হিদায়াতপ্রাপ্ত ইমামদের ছত্রছায়ায় একত্রিত হয়েছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধাচারণে লিপ্ত হন নি, এছাড়া যে সমস্ত বিষয়ে আমাদের পূর্বসূরী সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণ একমত হয়েছেন তারা তাঁর অনুসরণ করে, তাই এ সমস্ত কারণেই তাঁদেরকে আল-জামা‘আত বলা হয়।
এছাড়া রাসূলের সুন্নাহর অনুসারী হওয়ার কারণে কখনো তাদেরকে আহলুল আসার, কখনো অনুকরণকারী দল, বা সাহায্যপ্রাপ্ত ও সফলতা লাভকারী দল বলেও আখ্যায়িত করা হয়। সালফে সালেহীন বলতে বুঝায় প্রথম তিন সোনালী যুগের লোকদের অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও আমাদের সম্মানিত হেদায়েত প্রাপ্ত ইমামগণ।
প্রথম অধ্যায়
ইসলামী জ্ঞান অন্বেষণের মূল উৎস এবং উহার প্রমাণপঞ্জি উপস্থাপনের পদ্ধতি
- ১. ইসলামী আকীদা গ্রহণের মূল উৎস কুরআনে করীম, সহীহ হাদীস ও সালফে-সালেহীনের ইজমা।
- ২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণিত সহীহ হাদীস গ্রহণ করা ওয়াজিব, এমনকি তা যদি খবরে আহাদও হয়।
- ৩. কুরআন-সুন্নাহ বুঝার প্রধান উপাদান, কুরআন সুন্নারই অন্যান্য পাঠ, যার মধ্যে রয়েছে অপর আয়াত বা হাদীসের স্পষ্ট ব্যাখ্যা, এছাড়া আমাদের পূর্বসূরী সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন এবং আমাদের সম্মানিত ইমামগণ প্রদত্ত ব্যাখ্যা। আর আরবদের ভাষায় যা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত। তবে ভাষাগত দিক থেকে অন্য কোন অর্থের বম্ভাবনা থাকলেও সাহাবা, তাবেয়ীনদের ব্যাখ্যার বিপরীত কোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা যাবে না। সম্ভাব্য কোন অর্থ এর বিপরীত কোন অর্থ বহন করলেও তাঁদের ব্যাখ্যার উপরেই অটল থাকতে হবে।
- ৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামের মূল বিষয়বস্তুসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করেছেন। এজন্য দ্বীনের মধ্যে নতুন করে কোন কিছু সংযোজন করার কারও অধিকার নেই।
- ৫. প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সর্ব বিষয়ে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সামনে আত্মসমর্পন করা। সুতরাং নিজের মানসিক ঝোঁক বা ধারণার বশঃবর্তী হয়ে, আবেগপ্রবণ হয়ে অথবা বুদ্ধির জোরে বা যুক্তি দিয়ে কিংবা কাশফ অথবা কোন পীর-উস্তাদের কথা, কোন ইমামের উক্তির অজুহাত দিয়ে কুরআন সুন্নাহর কোন কিছুর বিরোধিতা করা যাবে না।
- ৬. কুরআন, সুন্নার সাথে জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেকের কোন সংঘাত বা বিরোধ নেই। কিন্তু কোন সময় যদি উভয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয় এমতাবস্থায় কুরআন সুন্নাহর অর্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
- ৭. আকীদা সংক্রান্ত বিষয়ে শরী‘আতসম্মত ভাষাও শব্দ প্রয়োগ করা এবং বিদ‘আতী পরিভাষাসমূহ বর্জন করা আর সংক্ষেপে বর্ণিত শব্দ, বাক্য বা বিষয়সমূহ যা বুঝতে ভুল-শুদ্ধ উভয়েরই সম্ভাবনা থাকে, এমতাবস্থায় বক্তা থেকে ঐ সমস্ত বাক্য বা শব্দের বিস্তারিত ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করে জেনে নেয়া, তারপর তন্মধ্য থেকে যা হক বা সঠিক বলে প্রমাণিত হবে তা শরী‘আত সমর্থিত শব্দের মাধ্যমে সাব্যস্ত করতে হবে, আর যা বাতিল তা বর্জন করতে হবে।
- ৮. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন নিষ্পাপ, ভ্রুল-ত্রুটির উর্ধ্বে। আর সামষ্টিকভাবে মুসলিম উম্মাহও ভ্রান্তির উপরে একত্রিত হওয়া থেকে মুক্ত। কিন্তু ব্যক্তি হিসাবে (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত) এ উম্মতের কেউই নিষ্পাপ নন। আমাদের সম্মানিত ইমামগণ এবং অন্যান্যরা যে সব বিষয়ে মত পার্থক্য করেছেন, সে সমস্ত বিষয়ের সূরাহার জন্য কুরআন ও সুন্নার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তবে উম্মতের মুজতাহিগণের যে সমস্ত ভুল-ত্রুটি হবে সেগুলোর জন্য সঙ্গত ওজর ছিল বলে ধরে নিতে হবে। [অর্থাৎ ইজতিহাদী ভুলের কারণে তাঁদের মর্যাদা সমুন্নতই থাকবে এবং তাঁদের প্রতি সুন্দর ধারণা পোষণ করতে হবে।]
- ৯. এ উম্মতের মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান সমৃদ্ধ ও ইলহামপ্রাপ্ত অনেক মনীষী রয়েছেন। সুস্বপ্ন সত্য এবং তা নবুওয়াতের একাংশ। সত্য-সঠিক দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের বাণী সত্য এবং তা শরী‘আত সম্মতভাবে কারামত বা সুসংবাদের অন্তর্ভুক্ত। তবে এটি ইসলামী আকীদা বা শরী‘আত প্রবর্তনের কোন উৎস নয়।
- ১০. দ্বীনের কোন বিষয়ে অযথা তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া অত্যন্ত জঘন্য ও নিন্দনীয়। তবে উত্তম পন্থায় বিতর্ক বৈধ। আর যে সমস্ত বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হওয়া থেকে শরী‘আত নিষেধ করেছে, তা থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য। এমনিভাবে অজানা বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হওয়াও মুসলিমদের জন্য অনুচিৎ, বরং ঐ অজানা বিষয় সর্বজ্ঞ ও সর্বজ্ঞানী আল্লাহর উপর সোপর্দ করা উচিৎ।
- ১১. কোন বিষয়ে বর্জন গ্রহণের জন্য ওহির পথ অবলম্বন করতে হবে। অনুরূপভাবে কোন বিষয় বিশ্বাস বা সাব্যস্ত করার জন্যও ওহীর পদ্ধতির অনুসরণ করতে হবে। সুতরাং বিদ‘আতকে প্রতিহত করার জন্য বিদআতের আশ্রয় নেয়া যাবে না। আর কোন বিষয়ের অবজ্ঞা ঠেকাতে অতিরঞ্জন করার মাধ্যমে মোকাবেলা করা যাবে না। অনুরূপ কোন বিষয়ের অতিরঞ্জন ঠেকাতে অবজ্ঞাও করা যাবে না। [অর্থাৎ যতটুকু শরী‘আত সমর্থন করে ততটুকুই করা যাবে]
- ১২. দ্বীনের মধ্যে নব সৃষ্ট সব কিছুই বিদ‘আত এবং প্রতিটি বিদ‘আতই হলো পথভ্রষ্টতা। আর প্রত্যেক পথভ্রষ্টতার পরিণতিই জাহান্নাম।
পাদটিকা
[১] তন্মধ্যে তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত ও তাওহীদুর উলুহিয়্যাহ বা ইবাদাতের ক্ষেত্রে তাওহীদ অন্যতম।
[২] খবরে আহাদ ঐ হাদীসকে বলে, যে হাদীস পরস্পরায় অসংখ্য সাহাবী হতে বর্ণিত হয় নি।
Pingback: আকিদার মূলনীতিঃ জ্ঞান ও বিশ্বাস বিষয়ক তাওহীদ -২ | In Search of Inner Peace | ইসলামিক বাংলা ব্লগ
Pingback: আকিদার মূলনীতিঃ ইচ্ছা বা চাওয়ার ক্ষেত্রে তাওহীদ -৩ | In Search of Inner Peace | ইসলামিক বাংলা ব্লগ
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের নাম করুন। কারা ঐ জামাত?
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত এর বর্ণনা এখানে দেওয়া আছেঃ
এখন আপনাকে খুজে বের করতে কারা এই সজ্ঞা অনুযায়ী এই জামাতের অনুসারী। তা অবশ্যি তাদের আকিদা, কাজ-কর্মের উপর ভিত্তি করে নির্ধারন করতে হবে। মুখে দাবি করলেই আহলে সুন্নাহ বা আহলে বিদাহ হই না বরং তাদের আকিদায় বলে দিবে তারা কোন দলের অন্তর্ভুক্ত।