ইতিহাসের আলোকে রমজান মাস

ড. আবদুল্লাহ হাকিম কুইক সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য যিনি সমগ্র বিশ্বের রব। তিনিই সেই সত্তা, যিনি তাঁর মহান কোরআন শরীফে বর্ণনা করেন—‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা … Continue reading

কুরআন বুঝতে হলে

আমরা যারা কুরআন পড়তে, কুরআন থেকে শিক্ষা নিতে আগ্রহী তাদের শুধু কুরআনকে পড়লেই চলবেনা, এর যথাযথ অর্থও হৃদয়ংগম করতে হবে। আমাদের বর্তমান ব্যক্তিজীবন, সমাজ ও বিশ্বব্যবস্থার (World Order) আলোকে কুরআনের বাণী কি শিক্ষা দেয় তা বুঝতে হবে। আমাদের মাঝে কুরআন তেলাওয়াত বহু লোকেই করে, কিন্তু অধিকাংশই বুঝে পড়েন না। আরো আশঙ্কাজনক ব্যাপার হচ্ছে এদের অনেকেই না বুঝে পড়েই তৃপ্ত। কিন্তু আল্লাহ যখন কুরআন পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন তখন কি না বুঝে পড়তে বলেছেন? কুরআন হাদীস থেকে না বুঝে পড়ার কোন নির্দেশ এসেছে? মানুষ যদি না বুঝেই পড়ে তবে কুরআনে এত জ্ঞানগর্ভ ভাষণের কিইবা দরকার ছিল? সারা কুরআন তো আলিফ, লাম, মীম এর মত হরফ (যার অর্থ আল্লাহই ভাল জানেন) দিয়ে ভরা থাকতে পারত। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি কুরআন নাযিলের একটা কারণ হচ্ছে আল্লাহ চান আমরা তাঁর বাণীকে বুঝার চেষ্টা করি, তাঁর আয়াত নিয়ে চিন্তা করি। এখন এই বুঝার পথে অগ্রসর হবার আগে কয়েকটা ব্যাপার জানা থাকলে আমরা কুরআন পড়ে অনেক বেশি লাভবান হতে পারব। নচেৎ দেখা যাবে অর্থ বুঝে কুরআন পড়েও এর মূল বক্তব্য আমাদের কাছে অস্পষ্ট রয়ে যাবে অথবা মাঝপথেই আমরা উদ্যম হারিয়ে ফেলব।
কুরআন প্রাচীন কালের ইতিহাস বর্ণনাকারী কোন উপন্যাস নয়, এটি মানুষের জন্য পথনির্দেশ, এটি মানুষের চোখ খুলে দেয়। যারা কুরআনকে বুঝে পথ চলবে তারা পথ হারাবে না। এই কুরআনকে বুঝার জন্য আমাদের যেসব বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে তা হচ্ছে-

কুরআনের মূল লক্ষ্য:

কেউ যদি কুরআনের মূল লক্ষ্যগুলোকে সামনে না রেখে কুরআন পড়েন তবে তিনি সেই ব্যক্তির মত যিনি সবচেয়ে লেটেস্ট মডেলের কম্পিউটার কিনে শুধু গেমস্ খেলার জন্য একে ব্যবহার করেন। কোন বই পড়ে লাভবান হতে হলে একজনকে বইটির মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য মাথায় রাখতে হবে। ব্যক্তির উদ্দেশ্য ভেদে পড়ার ধরনও বিভিন্ন হয়। কেউ যদি শুধু বরকত লাভের আশায় কুরআন পড়েন তবে তিনি অর্থ বুঝার তোয়াক্কা না করে দ্রুত পড়ে যান। একজন মুসলিম যদি না বুঝে কুরআন পড়েন তাহলে খুব একটা লাভ হবেনা। এভাবে কুরআন পড়লে আল্লাহর বাণী একজনের উপর প্রভাব ফেলতে পারেনা। তাই আমাদের কুরআন অধ্যয়নকে অর্থবহ করতে কুরআনের নিম্নোক্ত মূল লক্ষ্যগুলো মাথায় রাখা দরকার-

  • ক) কুরআন আল্লাহর তাওহীদ শিক্ষা দেয়: মানবমন সবসময় তার স্রষ্টাকে জানতে চায়। কুরআন মানুষকে সেই স্রষ্টা, তাঁর নির্দেশাবলী ও তাঁর গুণাবলী সম্পর্কে জানায়। কুরআনের এই শিক্ষা থেকে মানুষ আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়ে ও আরো বেশি করে আল্লাহকে ভালোবাসতে শুরু করে। আল্লাহ যদি তাঁর সম্পর্কে না জানাতেন তবে মানুষের পক্ষে আন্দাজ অনুমান করে কখনই আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় পাওয়া সম্ভব হতনা। তাই কেউ যখন কুরআন পড়ে তখন তার বুঝা উচিত সে তার স্রষ্টা ও প্রতিপালক সম্পর্কে পড়ছে। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর এক সাহাবীকে প্রশ্ন করেছিলেন,‘তুমি কি জানো কুরআনের কোন আয়াতটি সবচেয়ে সেরা?’ সাহাবী সঠিক উত্তর দিয়েছিলেন- সেই আয়াতটি হচ্ছে আয়াতুল কুরসী।

    “আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, তিনি জীবিত, সবকিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারেনা এবং নিদ্রাও নয়। আসমান ও যমীনে যা কিছু রয়েছে, সবই তাঁর। কে আছে এমন, যে সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া? দৃষ্টির সামনে (পৃথিবী) কিংবা পেছনে (আখিরাত) যা কিছু রয়েছে সবই তিনি জানেন। তাঁর জ্ঞানসীমা থেকে তারা কোন কিছুকেই পরিবেষ্টিত করতে পারেনা, যতটুকু তিনি ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত। তাঁর কুরসি সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। আর সেগুলোকে ধারণ করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ এবং সর্বাপেক্ষা মহান।” (সূরা বাকারা, ২:২৫৫)

    কুরআনের সেরা আয়াতটি পুরোটাই আল্লাহর মহত্ত্বের বর্ণনা। এ থেকে পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে আল্লাহ তাআলার নিজের স্বরূপ সম্পর্কে জানানোই কুরআনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সূরা ইখলাসকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ বলা হয়েছে, এই সূরাও আল্লাহর বর্ণনা। এই বর্ণনাগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি ইবাদত শুধু আল্লাহরই জন্য। তাই এখন থেকে আমরা আল্লাহর গুণবাচক আয়াত পড়ার সময় স্মরণ রাখব যে এগুলো বুঝা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

  • খ) কুরআন সঠিক পথ দেখায়: আল্লাহর নাম, গুণাবলী জানার পর যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উপায় জানা। আমরা প্রতি নামাযের প্রতি রাকাতে আল্লাহর কাছে একটা মূল্যবান বস্তু চাই:

    “আমাদের সরল পথ দেখাও, সে সমস্ত লোকের পথ যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাজিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।” (সূরা ফাতিহা, ১:৫-৭)।

    আল্লাহ আমাদের এ ডাকে সাড়া দিয়ে সূরা বাকারার শুরুতেই বলেছেন,

    “এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই, পথ প্রদর্শনকারী মুত্তাকীদের জন্য।” (সূরা বাকারা ২:২)

    অর্থাৎ মুত্তাকীদের জন্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কুরআন দিক নির্দেশনা দেয়। রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহও এই দিক নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত কেননা কুরআনেই সুন্নাহর অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। এভাবে কুরআন পড়ার মাধ্যমে আমরা জানতে পারব কিভাবে কোন পথে গেলে আল্লাহ আমাদের উপর খুশি হবেন। আল্লাহকে খুশি করতে পারলেই দুনিয়া ও আখেরাতে আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি। কেয়ামত পর্যন্ত কুরআন মুসলিমদের সরল পথ দেখাবে, আমাদের তাই সরল পথের সন্ধানে কুরআনের কাছে ধর্ণা দিতে হবে।

  • গ) কুরআন ব্যক্তিসত্তাকে পরিশুদ্ধ করতে চায়: কুরআন শুধুমাত্র একটি বিধিবিধানের গ্রন্থ নয়, এটি এমন একটি গ্রন্থ যা একজন মানুষের চরিত্র গড়ে তোলে। কুরআন শুধু আমাদের সঠিক পথের জ্ঞানই (ইল্ম) দেয়না বরং সেই সঠিক কাজ করার জন্য ভীতি, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধও (তাকওয়া) ঢেলে দেয়। কুরআনে নানাভাবে এই উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে; যেমন আল্লাহ মানুষের কাছে এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর স্বরূপ বর্ণনা করেছেন, পৃথিবীর আনন্দের সাথে জান্নাতের পার্থক্য দেখিয়েছেন, তিনি আরও বর্ণনা করেছেন বিচার দিবসে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের পরিণাম। কুরআনে প্রায় প্রতিটি বিধান বর্ণনার শেষে আল্লাহর স্মরণ, অনুগতদের জন্য পুরষ্কারের প্রতিশ্রুতি এবং অবাধ্যদের জন্য শাস্তির প্রতিজ্ঞা করা হয়েছে। এই ইলম এবং তাকওয়া একসাথে বর্ণনার অসংখ্য উদাহরণ আছে, যেমন সূরা বাকারায় ২২১-২৪২ আয়াত পর্যন্ত বারোটি ভিন্ন ধরনের বিধান বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিটি বিধানের পর পরই আল্লাহ তাঁর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে তাঁকে ভয় করার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন।
    আল্লাহ কেন ‘ইলমের’ সাথে ‘তাকওয়া’ জুড়ে দিলেন? এর কারণ হচ্ছে শুধু ভাল-মন্দের বা সঠিক-বেঠিকের জ্ঞানই মানুষকে সঠিক পথে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়, এর জন্য চাই অন্তেরর তাগিদ। এর বাস্তব উদাহরণ পশ্চিমা বিশ্বে দেখা যায় — পশ্চিমারা জানে ধূমপান, মদ্যপান, নেশাদ্রব্য ক্ষতিকর কিন্তু তবুও তাদের কয়জন এসব থেকে দূরে থাকার প্রেরণা পায়? এজন্য কুরআন পড়ার সময় এই তাকওয়ার বাণীগুলো আমাদের হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করতে হবে।
  • ঘ) কুরআন ইসলামী সমাজ তৈরির কথা বলে: কুরআন মানুষকে বৃহত্তর সমাজের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে, কুরআনে এসেছে সামাজিক দায়িত্ব, সামাজিক অধিকার, পারস্পারিক সমঝোতার নির্দেশ।

    “হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট [তোমাদের অধিকার] চেয়ে থাক এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে সর্তকতা অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন।” (সূরা নিসা ৪:১)

    কুরআন আল্লাহর সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনায় পরিচালিত এক অনন্য সমাজ গড়তে বলে। ধর্মবিমুখ সমাজ থেকে তা আলাদা। ইসলামী সমাজ ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে।

    “তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০)

    কুরআনের সমাজ ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারকে প্রশ্রয় দেয়না, এখানের সদস্যরা একত্রে মন্দকে দূর করে ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে। এই চিন্তাধারা পশ্চিমাদের থেকে ভিন্ন। সেখানে কেউ সমাজের তোয়াক্কা না করে নিন্দনীয় কাজে লিপ্ত থাকতে পারে, সমাজ সেসব দেখেও না দেখার ভান করে। এজন্য একজন যখন কুরআন পড়ে, তার অবশ্যই বুঝা উচিত কুরআন তাকে সমাজ তথা গোটা মানবজাতির সদস্য হিসেবে তার কর্তব্য ও অধিকার প্রদর্শন করছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কুরআন অধ্যয়ন করলে প্রতিটি মুসলিমই নিজ জাতি ও পৃথিবীর জন্য উপকারী বলে প্রতীয়মান হবে।

  • ঙ) কুরআন মুসলিমদের প্রতিপক্ষ চিনিয়ে দেয়: ইসলামের প্রসার একটি আদর্শগত বিপ্লবের মত যা সকল জাহিলিয়াতের শিকড় উপড়ে ফেলে। এই পরিবর্তন করতে গিয়ে বাধা আসবে। ভ্রান্ত পথে পরিচালিত বিলাসী শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতার পরিবর্তন চাইবেনা। সাইয়েদ কুতুবের মতে ইতিহাস শিক্ষা দেয় জাহিলি সমাজ শান্তি চায়না, তারা যুদ্ধের পথ বেছে নেয়। এই সংঘাতে আল্লাহ মুসলিমদের দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, তিনি জানিয়েছেন কিভাবে শত্রুর বিরুদ্ধে শক্তি অর্জন করতে হয়, সংঘাতের সময় কি নীতি অবলম্বন করতে হয়। মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু শয়তান। তার থেকে আত্মরক্ষার জন্য আল্লাহ শিখিয়ে দিয়েছেন,

    “যদি শয়তানের পক্ষ থেকে আপনি কিছু কুমন্ত্রণা অনুভব করেন, তবে আল্লাহর শরণাপন্নব হোন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৬)

    মুসলিমদের আরো শত্রু আছে, তাদের আল্লাহ পরিষ্কার ভাবে চিনিয়ে দিয়েছেন। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন অবিশ্বাসীরা, মুশরিক, ইহুদি ও খ্রীস্টানরা কিভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। মুসলিমদের আভ্যন্তরীণ শত্রু মুনাফিকদের ব্যাপারেও আল্লাহ দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন (যেমন সূরা মুনাফিকুন)। আল্লাহ আরও এক শত্রুর কথা জানিয়েছেন, যাকে তিনি না চিনিয়ে দিলে মানুষ বুঝতে পারতোনা – সে হচ্ছে নিজ নফ্স।

    “যারা নিজ নফসের লালসা থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।” (সূরা আল হাশর, ৫৯:৯)

    মুসলিমদের কুরআন পাঠ করার সময় তাই খেয়াল রাখতে হবে আল্লাহ তাকে সত্যিকারের শত্রুদের ব্যাপারে সর্তক করছেন, এই শত্রুরা তাকে সরল পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করছে। শত্রুদের আচরণ ও কিভাবে আত্মরক্ষা করা যায় সে সম্পর্কে কুরআনের আয়াতগুলো মনে গেঁথে নেয়া প্রয়োজন। উপরে আলোচিত কুরআনের লক্ষ্যগুলো মূলত একটি লক্ষ্য থেকে উৎসারিত, আর তা হচ্ছে এক আল্লাহকে বিশ্বাস (তাওহীদ)। এক আল্লাহকে শুধু স্রষ্টা হিসেবে মানাই যথেষ্ট না, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নেয়াও তাওহীদের অংশ।

কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য এবং কুরআন পাঠে আমাদের আচরন

বিসমিল্লাহর রাহমানির রাহীম। সকল প্রশংসা আল্লাহরই জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করছি এবং তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। তাঁরই নিকট ক্ষমা চাচ্ছি। তাঁরই কাছে তওবা করছি। তাঁরই কাছে আমাদের নফসের অমঙ্গল এবং মন্দ আমল হতে আশ্রয় চাচ্ছি।

আল্লাহ তাআলা যাকে হিদায়েত দান করেন কেউ তাকে পথ ভ্রষ্ট করতে পারে না আর যাকে গোমরাহ করেন তাকে কেউ হিদায়াত দিতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি একক। তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।

কুরআন যেজন্য পড়ব

আলিফ লাম রা; এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি- যাতে আপনি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেনপরক্রান্ত, প্রশংসার যোগ্য সত্তার পথের দিকে” (সূরা ইবরাহীম, ১৪:১)

কুরআনের এই আয়াত পড়ে ইসলামের কোন সমালোচক প্রশ্ন করতে পারেন কুরআনের এই কথাগুলো কি সত্য? কিন্তু মুসলিমদের বাস্তব অবস্থার সাথে এই কথার কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায়না। মুসলিমরা (প্রায়) অন্ধকারেই বসবাস করছে। অবশ্যই আল্লাহর বাণী সত্য, এতে কোন সন্দেহ নেই। কেউ যদি কুরআনের ইতিহাস অধ্যয়ন করে এবং পূর্ববর্তীদের উপর কুরআনের প্রভাব প্রত্যক্ষ করে তবে দেখবে কুরআনের এই বাণী সত্যে পরিণত হয়েছিল। এটা সত্যিই দুঃখজনক যে আজকের মুসলিমরা এই অসাধারণ গ্রন্থের অধিকারী হয়েও এ থেকে হেদায়েতের নূর পাচ্ছেনা। এর কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যায় কুরআনকে অবমূল্যায়ন ও বুঝতে না পারার মধ্যেই সমস্যা নিহিত।

কুরআন এই পৃথিবী ও আখেরাতে মুমিনের জন্য সম্মান বয়ে আনে। আল্লাহ কুরআনে বলছেন,

আমি তোমাদের প্রতি একটি কিতাব অবতীর্ণ করেছি; এতে তোমাদের জন্য উপদেশ রয়েছে তোমরা কি বোঝ না?” (সূরা আমবিয়া, ২১:১০)

এই আয়াতটি আরবের কুরাইশদের উপর নাজিল হয়েছিল। কুরআন নাজিলের আগে কেউ তাদের সম্মান দিতনা। কিন্তু কুরআনের কারণেই তাদের সম্মান বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মূলনীতি এখনও অপরিবর্তিত। যেমনটি রাসূল (সা) বলেছেন:

ল্লা তাঁর এই কিতাব দ্বারা কিছু লোককে উপরে উঠান আর কিছু লোককে নামিয়ে দেন নিচে” (মুসলিম)

কোন মুমিন যদি সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায় এবং অন্যের চোখে নিচু হতে না চায় তবে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন তাদের কি করতে হবে: কুরআনের কাছে ফিরতে হবে এবং এর শিক্ষাকে জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। এতো গেল দুনিয়ার সম্মান। আখেরাতেও কুরআন মুমিনদের জন্য সম্মান বয়ে আনবে। আবি উমামা (রা) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি:

তোমরা কুরআন পাঠ কর কিয়ামতের দিন কুরআন তার সাথীদের জন্যে সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে” (মুসলিম)

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

সকল কথার উপর ল্লাহর বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব ঠিক সেরকম, যেমন সকল সৃষ্টির উপর ল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব” (তিরমিযি)

কোন ব্যক্তি যখন এই কুরআনের প্রকৃত মর্যাদা বুঝতে পারবে তখন সে অবশ্যই নিজের কিছু সময় এর অধ্যয়নে ব্যয় করবে। কুরআনের প্রতিটা বাক্য, প্রতিটা শব্দ, প্রতিটি অক্ষর আল্লাহর পক্ষ থেকে যিনি জানেন যা কিছু গোপন ও প্রকাশ্য, যিনি সবচেয়ে জ্ঞানী, যিনি প্রবল পরাক্রমশালী ও সবকিছুর মালিক। কুরআন তাই জ্ঞানের উৎস হিসেবে অনন্য, এতে কোন ভুল নেই এবং মানুষের হেদায়েতের জন্য প্রয়োজনীয় সবই এতে বিদ্যমান। একজন মুমিনের কি কুরআন না পড়ে হাত পা গুটিয়ে রাখা মানায়?

একজন মুসলিম আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। এই ভালবাসার দাবী কুরআনকে ভালোবাসা। আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদ (রা) বলেন,

কেউ যদি জানতে চায় সে ল্লা তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে কিনা তবে তার দেখা উচিত সে কুরআনকে ভালোবাসে কিনা যদি সে কুরআনকে ভালোবাসে তবে সে ল্লা তাঁর রাসূলকেও ভালোবাসে

আল্লাহ কুরআনে বলেছেন,

তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং ল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১১০)

সবচেয়ে ভালো যে কাজের আদেশ মুসলিমরা দিতে পারে তা হল তাওহিদের প্রকৃত বিশ্বাস এবং কুরআনকে ধারণ ও প্রয়োগ করা। সবচেয়ে মন্দ যে কাজের নিষেধ করতে পারে তা হল অবিশ্বাস ও কুরআন থেকে মুখ ফেরানো। যেহেতু মুসলিমরা আজ তাদের কার্যকলাপ ও চিন্তা ধারার সাথে কুরআনের যোগসূত্র ব্যাপকভাবে হারিয়ে ফেলেছে তাই তারা আল্লাহর প্রদত্ত মহান দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়। এজন্য মানবতার আজ এই অবস্থা। বর্তমান কালের সাথে কুরআন নাজিলের সময়কার পরিস্থিতির খুব একটা পার্থক্য দেখা যায়না। ধর্মনিরপেক্ষতা, বস্তুবাদ প্রভৃতি নাস্তিক দর্শনে পৃথিবী ছেয়ে গেছে। এসব মানব সৃষ্ট মতবাদ কখনোই মানুষকে সত্যিকার সুখ দিতে পারেনা, এসব মতবাদ মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখাতে অক্ষম।

যে মুসলিম জাতি সমগ্র মানবজাতিকে পথ দেখাবে তারা আজ নিজেরাই অগণিত সমস্যায় জর্জরিত। তাদের এসব সমস্যার সমাধান কি কুরআনে দেয়া হয়নি? মুসলিমরা কুরআনে উত্তর খুঁজেনা বলেই তারা সমস্যার সমাধান পায়না। মুসলিমরা বন্ধু আর শত্রুর পার্থক্য করতেও অক্ষম হয়ে পড়েছে। মুসলিমরা সংখ্যায় এক বিলিয়নেরও অধিক (পৃথিবীর জনসংখ্যার চার ভাগের একভাগ), কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ মুসলিম শক্তিতে দুর্বল। বিভিন্ন দেশে মুসলিম নিধন চলছে। আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? এসব প্রশ্নের উত্তর কুরআনের পাতায় পাতায় সুস্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

এই কুরআন ল্লাহর মজবুত রজ্জু এর এক প্রান্ত ল্লাহর হাতে, আরেক প্রান্ত তোমাদের হাতে তোমরা যদি একে শক্ত করে ধর, তবে কখনও বিভ্রান্ত কিংবা ধ্বংস হবেনা” (আত তারগীব ওয়াত তারহীব)

তাও কি আমরা কুরআন পড়বনা? আমরা কি অবিশ্বাসীদের পদতলে নিজেদের লুটিয়ে দেব? আমরা কি আল্লাহর বাণীর প্রকৃত মর্যাদা দেবনা?

কুরআন যেজন্য নাযিল হয়েছে

কোন মুসলিমের কাছে যদি প্রশ্ন করা হয় কুরআন কেন নাযিল হয়েছিল? অধিকাংশই বলবে সওয়াব লাভের জন্য। সওয়াব লাভ একটা দিক বটে কিন্তু মূলত এই উদ্দেশ্যে কুরআন পাঠানো হয়নি। এর মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন:

এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং বুদ্ধিমানগণ যেন তা অনুধাবন করে” (সূরা ছোয়াদ, ৩৮:২৯)

অর্থাৎ কুরআন নাযিলের একটা কারণ এর অর্থ বুঝা। আমরা শুরুতেই যে কুরআনের আয়াতটি উল্লেখ করেছি তা থেকে আরো জানা যায় কুরআন নাযিলের আরেকটি কারণ অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মানুষকে জ্ঞানের আলোতে নিয়ে আসা। কুরআন নাযিলের আরো কয়েকটি কারণ কুরআনেই পাওয়া যায়। আল্লাহ বলছেন:

  • সত্য-মিথ্যার মানদন্ড সতর্কীকরণ: “পরম কল্যানময় সেই সত্তা যিনি নিজ বান্দার (মুহাম্মদ) প্রতি নাযিল করেছেন (সত্য মিথ্যার ফয়সালাকারী) মানদন্ড (কুরআন), যাতে করে তা বিশ্ববাসীর জন্য সতর্ককারীর ভূমিকা পালন করে।” (সূরা আল ফুরকান, ২৫:১)
  • মতভেদের ক্ষেত্রে মীমাংসা, বিশ্বাসীদের জন্য পথনির্দেশ করুণা: “আমি আপনার প্রতি এ গ্রন্থ এজন্যই নাযিল করেছি, যেন আপনি সরল পথ প্রদর্শনের জন্য তাদেরকে পরিষ্কার বর্ণনা করে দেন, যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে, এবং ঈমানদারদের ক্ষমা করার জন্য।” (সূরা আন নাহল, ১৬:৬৪)
  • বিচারকার্য: “এটা নির্ঘাত সত্য যে আমি আপনার প্রতি এ কিতাব নাযিল করেছি, যাতে করে আল্লাহর দেখানো সঠিক বিধান অনুসারে আপনি মানুষের মাঝে বিচার-ফয়সালা করতে পারেন। আর আপনি বিশ্বাসঘাতক লোকদের পক্ষে বিতর্ককারী হবেন না।” (সূরা আন নিসা ৪:১০৫)

কুরআন নাযিলের যে কারণগুলো আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন তা উপরের আয়াতগুলো থেকে জানা যায়। কারণগুলো হচ্ছে

  • মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসা
  • সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করে দেয়া
  • মানুষকে সতর্ক করা
  • সত্যনিষ্ঠ চিন্তাশীলদের চিন্তার খোরাক জোগানো
  • সরল পথ দেখানোর জন্য
  • আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করার জন্য

কুরআনের সাথে আমাদের আচরণ

আমরা আরবী ভাষায় কুরআন পড়ি কিন্তু অধিকাংশই এর অর্থ বুঝিনা। পৃথিবীর আর কোন বই আমরা না বুঝে পড়তে রাজি নই কিন্তু কুরআন না বুঝে পড়েও আমরা আত্মতৃপ্তি পাই, কেননা তেলাওয়াতের সওয়াবটাই আমাদের কাছে মুখ্য, আল্লাহ আমাদের কি করতে বললেন আর কি ছাড়তে বললেন তা মুখ্য না। এর ফলে আমরা শিক্ষিত হয়েও আজ ইসলামের দৃষ্টিতে চরম মূর্খ। অপরদিকে চিন্তা করে দেখি সাহাবাদের (রা) কথা, তারা অধিকাংশই ছিলেন অতি সাধারণ মানুষ, অধিকাংশই লেখাপড়া জানতেন না কিন্তু তাদের সাথে পরবর্তীদের তুলনাই চলেনা। তাদের সাথে আমাদের মূলত একটাই পার্থক্য, তারা কুরআনকে নিজেদের চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছিলেন। কুরআন ছাড়া তাদের জ্ঞান আহরণের আর কোন উৎস ছিলনা। আরবে তখন কোন মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেনি যা মানুষের জ্ঞান অর্জনে সহায়ক হবে। শুধু কুরআন জানা অল্পসংখ্যক সাহাবারাই তো অর্ধপৃথিবীকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে এসেছিলেন, যে কাজ আজ আমরা ভূরি ভূরি মুসলিমও করতে সক্ষম নই। কুরআন আমরা সযত্নে তুলে রাখি, শুধুমাত্র সে কুরআন খোলা হয় কারও মৃত্যুর সময় বা রমযান মাসে খতম করার অভিপ্রায়ে, বাকিটা সময় এর উপর ধুলো জমতে থাকে। আমরা যদি এই দুনিয়ায় ও আখেরাতে সফলকাম হতে চাই তবে কুরআন ও সুন্নাহকে (যা কিনা কুরআনেরই ব্যাখ্যা) আঁকড়ে ধরা ছাড়া আর কোন পথ নেই।

কেউ কেউ বলে থাকেন নিজে নিজে কুরআন পড়া যাবেনা, কুরআন পড়তে হবে শিক্ষকের কাছে। তারা আরো বলেন সাধারণ মানুষের জন্য কুরআন পড়ার চেয়ে দরূদ পড়া উত্তম। এর কারণ হিসেবে তারা বলেন দরূদ পড়লে সওয়াব আছে কিন্তু গুনাহ হবার সম্ভাবনা নেই কিন্তু একজন গুনাহগার যখন কুরআন পড়ে তখন তার গুনাহ আরো বেড়ে যায় কেননা সে কুরআনের বিরুদ্ধাচরণ করছে। এই যুক্তিতে কুরআন পাঠ ছেড়ে দেয়া একেবারেই মানায় না কারণ কুরআন পড়ার কারণে গুনাহ হয়নি, কুরআন না পড়লেও তার (অবাধ্যতার) গুনাহ একই থাকছে। এ প্রসঙ্গে খুররম মুরাদের বক্তব্য হচ্ছে,

একটু চিন্তা করে দেখুন, তাঁরা কি একজন আরবকে কুরআনের শাব্দিক অর্থ বুঝতে নিষেধ করতে পারেন? তাহলে কেন একজন অনারবের অনুবাদ পড়া উচিত নয়? তা ছাড়াও তাঁরা কি কাউকে অন্য কোন বিষয় পড়ে তা থেকে অর্থ অনুধাবন বা সন্ধান করা থেকে বিরত রাখতে পারেন? তাহলে কেন কুরআন অধ্যয়ন করে অর্থ বুঝার প্রয়াস চালাতে নিষেধ করা হবে? তাছাড়া মুসলিম কাফির নির্বিশেষে কুরআনের যে প্রথম অবতীর্ণ আয়াত সে সম্পর্কেই বা কি বলা যায়? তারা ছিল নিরক্ষর এবং বেদুইন, যাদের না ছিল জ্ঞানার্জনের কোন উপায়-উপকরণ তথাপি অনেক কাফির কারও সাহায্য ছাড়াই শুধুমাত্র শুনে এবং এমনকি প্রথমবার শুনেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন

শুধুমাত্র কুরআন শুনে মুশরিক উমর (রা) ঈমানদারে পরিণত হয়েছেন, খ্রীস্টান সম্রাট নাজ্জাশী অশ্রুপাত করেছেন এবং একদল জ্বীন মুহাম্মদ (সা) কে নবী বলে মেনে নিয়েছে। তাই কুরআন আমরা আলেমগণের তত্ত্বাবধানে থেকে শিখব, সে সুযোগ না হলে তাদের ব্যাখ্যা পড়ব কিন্তু কোন অবস্থায় কুরআন ছেড়ে দেবনা।

মুসলিম চরিত্রে রমযানের কাঙ্খিত প্রভাব – পর্ব ২

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “রমযানের আগমনে জান্নাতের দরজাগুলোকে খুলে দেয়া হয়”। প্রচুর পরিমাণে ভাল কাজ করে জান্নাতের নিকটবর্তী হওয়ার বিরাট সুযোগ আসে রমযানে। কিন্তু বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনা এবং সংযমের পরিবর্তে পরিণত হয়েছে উৎসবের মাসে! রমযানের রাতগুলি পরিণত হয় পার্টি এবং ভোজের রাত্রিতে যা কিনা কোন কোন দেশে ভোর পর্যন্ত চলে। সেখানে রাত পরিবর্তিত হয় দিনে, দিন পরিবর্তিত হয় রাতে (বহু মানুষই রোযার সময়টুকু ঘুমিয়ে কাটায়)। সাধারণতঃ সেহেরীতে মানুষ হালকা খাবারের বদলে পেট ভরে খায়। ফলে রোযা অবস্থায় খুব কম মানুষই প্রকৃত ক্ষুধার তাড়না বোধ করে। আবার ইফতারীতে আরেক দফা ভরপেট খাওয়া চলে, সেই সাথে রয়েছে রকমারী খাবারের আয়োজন। ফলে অনেকেই রমযান শেষে ওজন বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করে! কুরআন ও হাদিস অনুসারে রমযানে আমারা কিভাবে সর্বাধিক সাফল্য অর্জন ও দিক নির্দেশনা- প্রবন্ধটির একটি শুদ্ধ প্রয়াস। Continue reading

মুসলিম চরিত্রে রমযানের কাঙ্খিত প্রভাব – পর্ব ১

রমযানের গুরুত্ব:

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “রমযানের আগমনে জান্নাতের দরজাগুলোকে খুলে দেয়া হয়”। রমযানে অধিক পরিমাণে ভাল কাজ করে জান্নাতের নিকটবর্তী হওয়া যায়। রমযানে সিয়াম পালনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করিয়ে নেয়ার চমৎকার সুযোগ আসে। আবু হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে উদ্ধৃত করেছেন:

“যে রমযানে বিশুদ্ধ বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভের আশায় সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন।”

তেমনি তিনি (সা:) বলেছেন: ঈমান সহকারে রমযানে রাতে যে কিয়াম করবে (রাতে সালাত আদায় করবে), তার অতীতের সমস্ত গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেবেন। একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মিম্বরে ওঠার সময় তিনবার আমিন বলেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যাখ্যা করেন, জিবরীল (আঃ) এঁর তিনটি প্রার্থনার উত্তরে তিনি আমিন বলেন। তার মধ্যে একটি দুআ ছিল, যার ওপর রমযান আসে এবং চলে যায় অথচ তার গুনাহ মাফ হয় না, সে ক্ষতিগ্রস্ত/লাঞ্চিত হোক। বিশুদ্ধ নিয়তে সিয়াম পালন করলে মন্দের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার আত্মিক শক্তি অর্জিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: “রোযা ঢাল স্বরুপ”. একান্তভাবে আলল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য রোযা পালনকারীর জন্য বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। একটি হাদীসে কুদসীতে এসেছে আল্লাহ বলেন:

“আদম সন্তানের সকল কাজই তার নিজের জন্য, সিয়াম ব্যতীত। এটা শুধুই আমার জন্য, এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।”

রমযানের এইরূপ মর্যাদার প্রধান কারণ হচ্ছে এই মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ এবং পৃথিবীতে বিদ্যমান একমাত্র অপরিবর্তিত কিতাব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন:

“রমযান মাস সেই মাস, যে মাসে মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ স্বরুপ কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এতে রয়েছে সত্য পথ প্রদর্শনের জন্য বিশুদ্ধ শিক্ষা এবং (সত্য থেকে মিথ্যাকে পার্থক্য করার) মানদন্ড।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২:১৮৫)

কুরআন নাযিল মানবজাতির প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সর্ববৃহৎ অনুগ্রহ, যে মানবজাতি এর পূর্ববর্তী ওহী নাযিল হওয়ার পরবর্তী সময় থেকে নিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল। তাঁর দয়া নিঃসৃত এই অনুপম অনুগ্রহ ছাড়া হেদায়েতের স্তিমিত-প্রায় আলোটুকুও হারিয়ে যেত এবং গোটা মানবসমাজে প্রতিষ্ঠা হত অন্যায়ের রাজত্ব।

সিয়ামের উদ্দেশ্য:

রোযার মূল লক্ষ্য তাকওয়া (আল্লহ-ভীতি এবং তাঁর সম্পর্কে সচেতনতা) অর্জন। যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেন:

“…যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২ : ১৮৩)

তাকওয়া সর্বোচ্চ নৈতিক গুণগুলোর একটি, তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর ক্রোধ এবং নিজের মাঝে একটি ঢাল তৈরী করতে পারে। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর সমস্ত আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে সর্বদা সচেতন থাকা, অর্থাৎ হারাম পরিহার করা, মাকরূহ পরিহার করা এবং এমনকি সন্দেহের অবস্থায় হালালও পরিত্যাগ করা। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারেরা এটাও পরীক্ষা করে দেখেছেন যে রোযা বহুভাবে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। যেমন এ সময় শরীরে সঞ্চিত অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ব্যবহৃত হয়। এভাবে রোযা শরীরকে সবল রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা:

বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনা এবং সংযমের পরিবর্তে পরিণত হয়েছে উৎসবের মাসে! রমযানের রাতগুলি পরিণত হয় পার্টি এবং ভোজের রাত্রিতে যা কিনা কোন কোন দেশে ভোর পর্যন্ত চলে। সেখানে রাত পরিবর্তিত হয় দিনে, দিন পরিবর্তিত হয় রাতে (বহু মানুষই রোযার সময়টুকু ঘুমিয়ে কাটায়)। সাধারণতঃ সেহেরীতে মানুষ হালকা খাবারের বদলে পেট ভরে খায়। ফলে রোযা অবস্থায় খুব কম মানুষই প্রকৃত ক্ষুধার তাড়না বোধ করে। আবার ইফতারীতে আরেক দফা ভরপেট খাওয়া চলে, সেই সাথে রয়েছে রকমারী খাবারের আয়োজন। ফলে অনেকেই রমযান শেষে ওজন বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করে!

মুসলিম চরিত্রে সাওমের কাঙ্খিত প্রভাব: রমযানের শিক্ষাসমূহ

রমযানের সময়কাল অনেকটা বিদ্যালয়ের মত, যে সময়টিতে শেখার মত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোন কারণে নামায ছুটে গেলে আমরা তা পরবর্তীতে আদায় করে নিতে পারি, কিংবা রোযাও পরবর্তীতে রাখতে পারি, কিন্তু রমযানের সময়টি সেরকম নয়, এ সময় যদি পার হয়ে যায় এমন অবস্থায় যে আমরা রমযানের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গুলো নিতে পারলাম না, তবে তা বিরাট ক্ষতি।

প্রথম শিক্ষা: আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা বা তাকওয়া সৃষ্টি

কুরআনের যে আয়াতে সিয়ামের আদেশ দেয়া হয়েছে, সে আয়াতেই এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে:

“হে বিশ্বাসীগণ। তোমাদের জন্য সিয়াম পালনকে নির্ধারণ করা হল যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২ : ১৮৩)

এই তাকওয়া আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা, তাঁর উপস্থিতির উপলব্ধি, এবং এটা জানা যে তিনি আমাদের দেখছেন – যা আমাদেরকে ব্যক্তিগত জীবনে উন্নততর মানুষ হতে সাহায্য করবে। এই তাকওয়াকে আলী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন “আল্লাহর প্রতি ভয়, অল্পে সন্তুষ্টি এবং (পরবর্তী জীবনের পানে) যাত্রার প্রস্তুতি হিসেবে”। তাই ভয় তাকওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একদল লোক কেবল আল্লাহকে ভালবাসার কথা বলে থাকে এবং দাবী করে যে আল্লাহকে ভয় করে তাঁর ইবাদত করা ঠিক নয়, বরং তাঁকে শুধুমাত্র ভালবেসে ইবাদত করাটাই ঈমানের উন্নততর শর্ত । কিন্তু এ কথা ঠিক নয়। কুরআনের পাতায় পাতায় আল্লাহকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে। এই ভয়ের অর্থ তাঁর অবাধ্যতার কারণে যে শাস্তি রয়েছে, সেই শাস্তিকে ভয় করা। মানুষ আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য সাধনা করার মাধ্যমে তাকে ভালবাসবে, একই সাথে তাঁর শাস্তির ভয়ও অন্তের পোষণ করতে হবে। এ দুটো অবিচ্ছেদ্য এবং প্রকৃত ঈমানের মৌলিক দুটি উপাদান। আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, “যে রোযাদার লাইলাতুল ক্বদর লাভ করবে, তার পূর্ববর্তী পাপসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। এবং যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ঈমান সহকারে রমযানে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ সমূহকেও ক্ষমা করে দেয়া হবে“। এজন্য সিয়াম হতে হবে সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক প্রেরণার ভিত্তিতে। যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:

“যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।”

রোযা অবস্থায় আমাদের দিনগুলো রোযা না রাখা অবস্থায় আমাদের দিনগুলোর মত হওয়া উচিৎ নয় – এর মাঝে পার্থক্য থাকা উচিৎ। এই তাকওয়াই মানুষকে সর্বাবস্থায় অন্যায় থেকে বিরত রাখে, যদিও বা কেউ তাকে দেখতে না পায়। তাকওয়ার অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। কুরআনের আলোকে তাকওয়ার কয়েকটি উপকারিতা হচ্ছে:

  • সন্তান-সন্ততির কল্যাণ: আল্লাহ পাক বলেন: “দেয়ালের ব্যাপারটি হল এই যে এটা শহরের দুজন এতিম বালকের। এর নিচে এদের কিছু সম্পদ প্রোথিত রয়েছে, আর তাদের বাবা ছিলেন একজন সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তি। তাই তোমার রব চাইলেন যে তারা তাদের যৌবনে পৌঁছে যেন এই সম্পদ বের করে আনতে পারে, তাদের রবের পক্ষ থেকে করুণাস্বরুপ (সূরা আল কাহফ, ১৮ : ৮২)
  • আসমান এবং জমীন থেকে কল্যাণ:আল্লাহ পাক বলেন: “শহরগুলোর লোকেরা যদি কেবল ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, আমরা তাদের জন্য আসমান ও জমীন থেকে কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দিতাম।”(সূরা আল আ’রাফ, ৭ : ৯৬)
  • আল্লাহর পক্ষ থেকে রিযিক এবং কঠিন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “যেই তাকওয়া অবলম্বন করবে, আমি তার জন্য পথ বের করে দেব এবং এমন স্থান থেকে তাকে রিযিক দেব যা তার ধারণাতেই ছিল না।” (সূরা আত তালাক্ব, ৬৫ : ২-৩)
  • নিরাপত্তা: আল্লাহ পাক বলেন: “এবং আমি তাদেরকে রক্ষা করলাম যারা আমার প্রতি ঈমান এনেছিল ও মুত্তাকী ছিল।”
  • সার্বক্ষণিক আল্লাহর সাহায্যের উপস্থিতি: আল্লাহ পাক বলেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন যারা তাকওয়া অবলম্বনকারী এবং সর্বদা ইহসানকারী।” (সূরা আন নাহল, ১৬ :১২৮)
  • বিজয়: আল্লাহ পাক বলেন: “যারাই আল্লাহ এবং তার রাসূলের আনুগত্য করে এবং আল্লাহকে ভয়ের যোগ্য হিসেবে জানে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, তারাই বিজয়ী।” (সূরা আন নূর, ২৪ : ৫২)
  • জীবনের সুন্দর পরিসমাপ্তি: আল্লাহ পাক বলেন: “নিশ্চয়ই তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য রয়েছে সুন্দর পরিণতি।” (সূরা সোয়াদ, ৩৮ : ৪৯)
  • জান্নাত: আল্লাহ পাক বলেন: “এই হচ্ছে সেই জান্নাত, যা আমি আমার দাসেদের মধ্য থেকে তাদেরকে দেব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করত।” (সূরা মারইয়াম, ১৯ : ৬৩)